নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কিছুদিন আগেও গ্রামীণ বাংলার পথেঘাটে, কাদামাটিতে, কাচাসড়কে, খেতের আইলে, হাট-বাজারে যাওয়া, ফসল আনা-নেওয়া অথবা বরযাত্রী নিয়ে যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল গরুর গাড়ি। বিয়ে বাড়িতে বরযাত্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য গরুর গাড়ির কাফিলা সাজানো হতো খুবই আনন্দ মুখর পরিবেশে। সেই দৃশ্যটা মনে পড়লে আজও হৃদয়ে নাড়া দিয়ে উঠে। যদি ফিরে যেতে পারতাম সেই সোনালী অতীতে?
দুইটি শক্তিশালী গরু কাধে জোয়াল বাঁধা, কাঠের তৈরি চাকা আর চারপাশে লোহার চাকতি যেন চাকাটাকে আরো মজবুত করেছে, আর বাঁশের তৈরি গাড়ির বডি নিয়ে সেই গাড়ি চলত আপন গতিতে আস্তে আস্তে। চালকের হাতে চিকন লম্বা লাঠি, পিছনে বসে থাকা নববধূ, অথবা কৃষি পণ্য সঙ্গে নিয়ে চলা কৃষক। এ যেন গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক মূর্ত প্রতীক ছিল এই গরুর গাড়ি।
কিন্তু আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে সেই ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গরুর গাড়ি এখন শুধুই স্মৃতির পাতায় লেখা এক নাম।
কৃষক দরবেশ আলী (৮০) বলেন, মনে হয় এইতো সেদিন আমি গরুর গাড়িতে করে ধান, পাট, নিয়ে হাটে গেছি, বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে বাজার সদাই করে বাড়ি ফিরছি। আগে ধান কেটে গরুর গাড়িতে করে বাড়ি আনতাম। এখন অটো মেশিনে নিয়ে আসে, গরু নেই, গাড়িও নেই। তারপরও গরুর গাড়ির সেই চলা আর কাঁপানো মাটির আওয়াজ আজও মনে পড়ে আমার। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন এখনকার ছেলেমেয়েরা গরুর গাড়ি চিনেও না। অথচ এটা তাদের বাপ-দাদার যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ছিল।
আলিফ সোবহান চৌধুরী সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, আমি শুধু বইয়ে গরুর গাড়ির ছবি দেখেছি। একবার সোনারগাঁও শিক্ষা সফরে গিয়ে একটা গাড়ির ভাস্কর্য দেখি তারপর জানতে পারি এটা গরুর গাড়ির প্রতিক রূপে সেখানে আছে। সরাসরি কখনও দেখি নাই। অথচ এই গাড়ি নাকি এক সময়ের জনপ্রিয় বাহন ছিল। আমি যখন জানছি ভীষণ অবাক হয়েছি।
প্রকৃতপক্ষে, গরুর গাড়ি শুধু যোগাযোগ কিংবা কৃষি পণ্য পরিবহনের মাধ্যম ছিল না। এটি ছিল লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।
ঠিক এভাবে গাড়ি হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো একধরনের শিকড় বিচ্ছিন্নতা। আমরা যান্ত্রিক জীবনে প্রবেশ করলেও, ঐতিহ্য ভুলে গেলে সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে থাকে।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা কীভাবে তৈরি হতো গরুর গাড়ি, কীভাবে চালানো হতো, এর গুরুত্বই বা কি ছিল?
এখনো যদি আমরা প্রতীকী বা পর্যটন শিল্পে এই গরুর গাড়ি ব্যবহারে আনতে পারি তাহলে হয়তো বা এই লোকজন ঐতিহ্যকে কিছুটা হলেও ধরে রাখা সম্ভব।